অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: বিইআরসি’র কাগজের দাম বনাম বাজারের বাস্তবতা—এলপিজি খাতে কার নিয়ন্ত্রণ?
নিজস্ব প্রতিবেদক | মে ১৫, ২০২৬
বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এলপিজি (LPG) গ্যাসের বাজার এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে সাধারণত সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে অভিযান চালাতে দেখা যায়, সেখানে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারে অনেক কম দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে: আসলে এলপিজি বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—সরকার নাকি কোম্পানি?
সরকারি দাম বনাম বাজারের বাস্তবতা
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে। এপ্রিল ২০২৬-এর মাঝামাঝি থেকে মে মাসের বর্তমান সময় পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ১৯৪০ টাকা। অথচ রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ টাকার মধ্যে। অথচ মাত্র কয়েক দিন আগেও এই দাম ছিল ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকার আশেপাশে।
সরকারি দামের চেয়ে ১০০ থেকে ১৯০ টাকা কমে গ্যাস বিক্রির এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিইআরসি নির্ধারিত দাম কেবল একটি 'কাগজি হিসাব' হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা যদি ডিলার বা কোম্পানির কাছ থেকে কম দামে না পেতেন, তবে এত কমে বিক্রি করা অসম্ভব ছিল।
ডিলার ও কোম্পানির "অদৃশ্য" পাইকারি দর
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিলার ও কোম্পানিগুলো সরকারি দামের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মধ্যে একটি পাইকারি দর নির্ধারণ করছে। বাজারে অনেক বেশি কোম্পানি এবং তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় তারা সরকারি দামের চেয়ে অনেক কম রেটে ডিলারদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুর এলাকার একজন খুচরা বিক্রেতা জানান, "কোম্পানি আমাদের ১৭০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার দিচ্ছে। আমরা যদি ১৮০০ বা ১৮৫০ টাকায় বিক্রি করি, তবে আমাদের লাভ থাকে। কিন্তু সরকার কেন ১৯৪০ টাকা নির্ধারণ করল তা আমাদের মাথায় আসছে না।"
এই চিত্রটি প্রমাণ করে যে, যখন বাজারে সরবরাহ প্রচুর থাকে এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে, তখন সরকারি দামের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। বাজার তখন সম্পূর্ণভাবে কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
যখন দাম বাড়ে, তখন কোথায় থাকে নিয়ন্ত্রণ?
বর্তমান বাজারে দাম কম হলেও ইতিহাসের পাতা বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক বছরে যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে বা দেশে ডলার সংকট তীব্র হয়েছে, তখনই কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করে নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০-৩০০ টাকা বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। সেই সময়ে বিইআরসি বা ভোক্তা অধিকারের অভিযান চললেও তা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, সরকার যখন দাম বাড়িয়ে দেয়, তখন বাজারে তার প্রভাব পড়ে মুহূর্তেই। কিন্তু সরকার যখন দাম কমায়, তখন ব্যবসায়ীরা তা কার্যকর করতে চায় না। অথচ এখন কোম্পানিগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দাম কমাচ্ছে, তখন সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়েও নিচে নামা সম্ভব হচ্ছে। এটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, সরকার বাজারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
সাম্প্রতিক খবরের প্রতিফলন: সংকটের মূলে কী?
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এলপিজি খাতের এই অস্থিরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. ডলার সংকট ও এলসি সমস্যা: যদিও এখন বাজারে সরবরাহ বেশি, কিন্তু বড় কোম্পানিগুলো ডলার সংকটের কারণে নিয়মিত এলসি খুলতে না পারায় অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। ২. আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকো'র দাম (CP): বিইআরসি প্রতি মাসে সৌদি আরামকো’র কন্ট্রাক্ট প্রাইস অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু আমদানিকারক কোম্পানিগুলো বলছে, জাহাজ ভাড়া এবং পোর্ট চার্জের হিসাব বিইআরসি সঠিকভাবে করে না। ৩. বেসরকারি খাতের আধিপত্য: বাংলাদেশে এলপিজি বাজারের ৯৫ শতাংশের বেশি বেসরকারি খাতের হাতে। ফলে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত বাফার স্টক (Buffer Stock) না থাকায় তারা বাজারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারছে না।
ভোক্তা অধিকারের ভূমিকা ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুচরা দোকানে জরিমানা করে লাভ নেই যদি না মূলে (কোম্পানি পর্যায়ে) ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
একজন সাধারণ ভোক্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কখনো সরকার বলে ১৩০০ টাকা, দোকানে গেলে চায় ১৫০০ টাকা। এখন সরকার বলছে ১৯৪০ টাকা, দোকানদার দিচ্ছে ১৮০০ টাকায়। আমরা সাধারণ মানুষ আসলে কাকে বিশ্বাস করব? সরকার কি জানে না বাজারে কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে?"
ভবিষ্যতের রূপরেখা: বাজার স্থিতিশীল হবে কীভাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি বাজারকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হলে সরকারকে কেবল দাম ঘোষণা করলেই হবে না, বরং নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
সরকারি এলপিজির সরবরাহ বৃদ্ধি: সরকারি কোম্পানি এলপিজিএল (LPGL)-এর উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে হবে যাতে তারা বাজারের প্রাইস মেকার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিস্ট্রিবিউশন চেইন মনিটরিং: কোম্পানি থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের রসিদ বা ইনভয়েস বাধ্যতামূলক করতে হবে।
স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ: বিইআরসি-কে ডিলার ও পাইকারি পর্যায়ের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে বাস্তবসম্মত দাম নির্ধারণ করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের এলপিজি গ্যাস বাজার এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। সরকারি দামের চেয়ে কমে গ্যাস পাওয়া সাময়িকভাবে ক্রেতাদের জন্য খুশির খবর হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারের অব্যবস্থাপনাই ফুটিয়ে তুলছে। আজ কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতার কারণে দাম কমাচ্ছে, কিন্তু কাল যদি তারা একজোট হয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়, তবে সাধারণ মানুষকে পুনরায় জিম্মি হতে হবে।
সরকারের উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণের এই "প্রমাণিত অক্ষমতা" থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা। অন্যথায় ১৯৪০ টাকার গ্যাস ১৮০০ টাকায় পাওয়ার আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তথ্যসূত্র: * বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) মাসিক মূল্য প্রতিবেদন।
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ রিপোর্ট।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রেস রিলিজ।

Comments
Post a Comment